চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর আবারও দেশের আলোচনায়। যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলা, ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং পরে শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নতুন করে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। প্রশাসন এটিকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখছে না, বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী নিয়ন্ত্রণের অংশ বলেই মনে করছে।
হামলার ঘটনায় বড় মামলা
যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলার ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় এলাকার নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত মো. ইয়াসিনসহ ৪২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলায় সংঘবদ্ধ সশস্ত্র হামলা, সরকারি কাজে বাধা, সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস এবং বিস্ফোরক আইনের বিভিন্ন ধারা যুক্ত করা হয়েছে। ঘটনাটি শুধু হামলা নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে নিরাপত্তা বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কী ঘটেছিল সেই রাতে?
রোববার দিবাগত গভীর রাতে আলীনগর এলাকায় থাকা যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে এবং পরে বুলডোজার ব্যবহার করে ক্যাম্পের দেয়ালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ভেঙে ফেলে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় ছিল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারেন, সেজন্য অন্তত চারটি স্থানে রাস্তা কেটে দেওয়া হয়। অর্থাৎ পুরো হামলাটি পরিকল্পনা করেই চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরে যৌথ বাহিনীর পাল্টা অভিযানের মুখে হামলাকারীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গল সলিমপুর?
জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনের জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং এলাকা। যদিও এটি সীতাকুণ্ড উপজেলার আওতায়, তবে সেখানে পৌঁছাতে হয় চট্টগ্রাম নগর হয়ে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে। দুর্গম অবস্থানের কারণে এলাকাটিতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর প্রভাব তৈরি হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এলাকায় প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে। এই জমিকে কেন্দ্র করেই মূলত প্রভাব বিস্তার, দখল এবং সংঘবদ্ধ নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি গড়ে উঠেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
যৌথ বাহিনীর অভিযান কেন শুরু হয়েছিল?
গত ৯ মার্চ বড় একটি অভিযানের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ভবনে একটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। সেখানে পুলিশ, এপিবিএন, আরআরএফ ও র্যাবের প্রায় ১৩০ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।
মূল লক্ষ্য ছিল এলাকায় অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং স্থায়ীভাবে প্রশাসনিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলা দেখিয়ে দিয়েছে, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এখনও সক্রিয় এবং সংঘবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।
বিজিবি মোতায়েনের সিদ্ধান্ত
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন দুই প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের আবেদন করে। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই আবেদন অনুমোদন দেয়। আগামী ৩১ মে পর্যন্ত সেখানে বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্ভাব্য জঙ্গল সলিমপুর সফর ঘিরেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। র্যাব জানিয়েছে, নিরাপত্তায় কোনো ধরনের ঘাটতি রাখা হবে না।
তরুণ সমাজের জন্য বার্তা কী?
জঙ্গল সলিমপুরের ঘটনা শুধু একটি পাহাড়ি অঞ্চলের সংঘর্ষ নয়। এটি দেখিয়ে দেয়, দীর্ঘদিন কোনো এলাকায় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল থাকলে কীভাবে অপরাধী গোষ্ঠী শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাই তরুণদের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য বিশ্বাস না করা এবং এমন ঘটনাকে শুধু ভাইরাল নিউজ হিসেবে না দেখে এর সামাজিক ও নিরাপত্তাগত দিকটিও বোঝা।
সামনে কী হতে পারে?
প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ দেখে বোঝা যাচ্ছে, জঙ্গল সলিমপুরে আরও কঠোর অভিযান ও নজরদারি চালানো হতে পারে। তবে শুধু অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অবৈধ দখল বন্ধ করা এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার মধ্য দিয়েই জঙ্গল সলিমপুরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।


