বিশ্বকাপ মানেই শুধু মাঠের লড়াই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নানা ভবিষ্যদ্বাণী, কুসংস্কার, বিশ্বাস আর ভাইরাল গল্প। এবার আবারও আলোচনায় উঠে এসেছেন ঘানার সেই ওঝা নানা কোয়াকু বনসাম, যিনি এর আগে ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইনকে নিয়ে করা মন্তব্যের কারণে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছিলেন। এবার তাঁর নতুন দাবি, রাউন্ড অব ৩২-এ কেপ ভার্দের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেবে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। এই বক্তব্য ঘিরেই ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা।
কে এই নানা কোয়াকু বনসাম, কেন আবার আলোচনায়?
ঘানার ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক চর্চার সঙ্গে যুক্ত নানা কোয়াকু বনসাম এর আগেও একাধিকবার বিভিন্ন ফুটবল ম্যাচ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তবে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত হন ইংল্যান্ডের স্ট্রাইকার হ্যারি কেইনকে নিয়ে দেওয়া মন্তব্যের কারণে। ঘানার বিপক্ষে ম্যাচের আগে তিনি দাবি করেছিলেন, নিজের আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে কেইনকে গোল করা থেকে বিরত রাখবেন। কাকতালীয়ভাবে সেই ম্যাচে কেইন গোল করতে পারেননি এবং ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হয়। এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর জনপ্রিয়তা অনেকটাই বেড়ে যায়।
হ্যারি কেইনকে নিয়ে করা ভবিষ্যদ্বাণী কেন এত আলোচিত হয়েছিল?
ঘানার বিপক্ষে ম্যাচের আগে বনসাম বলেছিলেন, তিনি কেইনের বড় কোনো ক্ষতি চান না, তবে নিজের দেশের স্বার্থে তাকে গোল করা থেকে আটকানোর চেষ্টা করবেন। ম্যাচে ইংল্যান্ড গোলশূন্য ড্র করায় তাঁর বক্তব্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। ম্যাচের পর তিনি আবার দাবি করেন, এবার তিনি কেইনকে “মুক্ত” করে দেবেন এবং পরের ম্যাচেই ইংল্যান্ড অধিনায়ক গোল করবেন। পরবর্তী ম্যাচে পানামার বিপক্ষে কেইন সত্যিই গোল করেন। যদিও এটি নিছক কাকতালীয় ঘটনা বলেই অনেকের মত, তবুও এই ঘটনাই বনসামকে আরও বেশি ভাইরাল করে তোলে।
এবার আর্জেন্টিনাকে নিয়ে কী বললেন তিনি?
নানা কোয়াকু বনসামের সর্বশেষ দাবি আরও বড় চমক তৈরি করেছে। তাঁর মতে, রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে কেপ ভার্দে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে দেবে। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং টুর্নামেন্টের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে আর্জেন্টিনাকে অনেকেই শিরোপার দাবিদার মনে করছেন। তাই এমন ভবিষ্যদ্বাণী স্বাভাবিকভাবেই সমর্থকদের মধ্যে কৌতূহল এবং বিতর্ক দুটিই তৈরি করেছে। বিশেষ করে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে দলটি গ্রুপ পর্বে দারুণ পারফরম্যান্স দেখানোর পর এই মন্তব্য আরও বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ইতিহাস কী বলছে আর্জেন্টিনার পক্ষে?
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে অবশ্য আর্জেন্টিনার সমর্থকদের স্বস্তি পাওয়ার মতো অনেক কারণ রয়েছে। বিশ্বকাপে আফ্রিকার দলগুলোর বিপক্ষে এখন পর্যন্ত সাতবার খেলেছে আর্জেন্টিনা, যার মধ্যে ছয়বারই জয় পেয়েছে তারা। পাঁচটি জয় এসেছে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে এবং একটি জয় আইভরিকোস্টের বিপক্ষে। আফ্রিকার কোনো দলের কাছে তাদের একমাত্র হারটি ছিল ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের বিপক্ষে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এবারই প্রথম কোনো আফ্রিকান দলের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা, ফলে এই ম্যাচ নতুন এক ইতিহাসও তৈরি করতে চলেছে।
কেপ ভার্দে কি সত্যিই চমক দেখাতে পারবে?
আন্তর্জাতিক ফুটবলে কেপ ভার্দে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের শক্তিশালী দল হিসেবে গড়ে তুলেছে। শৃঙ্খলাবদ্ধ ডিফেন্স, দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক এবং দলগত ফুটবল তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তবে অভিজ্ঞতা, স্কোয়াডের গভীরতা এবং বড় মঞ্চে পারফরম্যান্সের বিচারে আর্জেন্টিনা এখনও স্পষ্ট ফেভারিট। তবুও নকআউট ফুটবলে একটি ভুলই পুরো ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারে। তাই কেপ ভার্দেকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগও নেই।
ভবিষ্যদ্বাণী নাকি শুধুই মনস্তাত্ত্বিক চাপ?
বিশ্ব ফুটবলে বড় টুর্নামেন্ট এলেই বিভিন্ন ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী সামনে আসে। কখনও তা নিছক বিনোদনের অংশ হয়ে থাকে, আবার কখনও সমর্থকদের মধ্যে মানসিক চাপ বা উত্তেজনা তৈরি করে। বাস্তবে ম্যাচের ফল নির্ধারণ হয় খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স, কৌশল, ফিটনেস এবং ম্যাচ পরিস্থিতির ওপর। তাই নানা কোয়াকু বনসামের এই মন্তব্য যতই ভাইরাল হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত মাঠের ৯০ মিনিটই বলে দেবে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়, নাকি আর্জেন্টিনা নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখে পরের ধাপে উঠে যায়।
শেষ কথা
ঘানার ভাইরাল ওঝার ভবিষ্যদ্বাণী ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে ফুটবল ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ভবিষ্যদ্বাণী নয়, মাঠের পারফরম্যান্সই শেষ কথা বলে। কেপ ভার্দে যদি সত্যিই চমক দেখাতে চায়, তাহলে তাদের খেলতে হবে নিজেদের সেরা ফুটবল। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার লক্ষ্য থাকবে নিজেদের ফেভারিট তকমার মর্যাদা ধরে রেখে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। এখন অপেক্ষা শুধু ম্যাচের শেষ বাঁশির।


