বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলা থেকে আসা জয় মহাপাত্রোর মৃত্যুর খবর আবারও নাড়িয়ে দিয়েছে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে চলমান উদ্বেগকে। পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, স্থানীয় এক ব্যক্তির হাতে মারধরের শিকার হওয়ার পর তাঁকে বিষপ্রয়োগ করা হয়, যার ফলেই শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু ঘটে। প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জয় মহাপাত্রো প্রাণ হারান। এই মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন।
সুনামগঞ্জের সেই রাত এবং একটি পরিবারের ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন
জয় মহাপাত্রোর পরিবার এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না কীভাবে একটি সাধারণ বিরোধ বা পরিস্থিতি এত ভয়াবহ পরিণতির দিকে গড়াতে পারে। তাদের দাবি, মারধর ও বিষপ্রয়োগের ঘটনা পরিকল্পিত ছিল এবং এর পেছনে ভয় ও বিদ্বেষ কাজ করেছে। পুলিশ তদন্তের কথা বললেও, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে অনেক সংখ্যালঘু পরিবার আশঙ্কা করে—এই তদন্ত আদৌ কতদূর যাবে।
মিঠুন সরকার থেকে জয় মহাপাত্র একই আতঙ্কের ধারাবাহিকতা
জয়ের মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন আগেই ২৫ বছর বয়সী মিঠুন সরকার নামে আরেক হিন্দু যুবকের মৃত্যু হয়। চুরির সন্দেহে উত্তেজিত একটি জনতার হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে তিনি একটি খালে ঝাঁপ দেন এবং সেখানেই তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, কীভাবে গুজব, সন্দেহ আর জনতার উন্মত্ততা বারবার সংখ্যালঘুদের জীবন কেড়ে নিচ্ছে।
নির্বাচনের আগে বাড়তে থাকা সংখ্যালঘু সহিংসতার অস্বস্তিকর বাস্তবতা
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং সামাজিক অসহিষ্ণুতার সম্মিলিত ফল। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে হিন্দু সম্প্রদায়।
দীপু চন্দ্র দাসের লিঞ্চিং এবং দেরিতে আসা বিচারিক তৎপরতা
ডিসেম্বরে গার্মেন্টস শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া লিঞ্চিংয়ের ঘটনা এখনো মানুষের স্মৃতিতে তাজা। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তাঁকে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হয়, পরে জনতার হাতে তুলে দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। সম্প্রতি ওই ঘটনায় মূল অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হলেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এমন নৃশংসতার পরেও বিচার কেন এত ধীর।
আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ এবং দক্ষিণ এশিয়ার জন্য সতর্কবার্তা
বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার নেতারা বলছেন, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সহিংসতা শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য একটি অশনিসংকেত।
প্রশ্ন একটাই সংখ্যালঘুর জীবন কি সত্যিই নিরাপদ
জয় মহাপাত্রর মৃত্যু, মিঠুন সরকারের পরিণতি কিংবা দীপু চন্দ্র দাসের লিঞ্চিং—সবকিছু মিলিয়ে একটি প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের জীবন কি সত্যিই নিরাপদ। রাষ্ট্র যদি দ্রুত ও দৃঢ়ভাবে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারে, তবে এই আতঙ্ক আরও গভীর হবে। নীরবতা ভাঙার সময় এখনই, নইলে প্রতিটি নতুন মৃত্যু শুধু আরেকটি শোকবার্তা হয়ে ইতিহাসে যোগ হবে।


