বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি যখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে, ঠিক সেই সময় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুই হিন্দু নাগরিকের হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। রানা প্রতাপ বৈরাগী ও সরৎ মণি চক্রবর্তী—দু’জনকেই অজ্ঞাত হামলাকারীরা তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে এসে প্রাণঘাতী হামলা চালায়। এই ঘটনাগুলো সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ধারাবাহিকতার অংশ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘটে চলা একের পর এক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে স্বাভাবিকভাবেই।
রানা প্রতাপ বৈরাগী কে ছিলেন এবং কীভাবে তিনি নিহত হন
৩৮ বছর বয়সী রানা প্রতাপ বৈরাগী খুলনা বিভাগের যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার আরুয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি কাপালিয়া বাজারে একটি আইস ফ্যাক্টরির মালিক ছিলেন এবং একই সঙ্গে নড়াইল থেকে প্রকাশিত দৈনিক বিডি খবর পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। সোমবার বিকেলে কাপালিয়া বাজারে নিজের কারখানায় অবস্থানকালে মোটরসাইকেলে আসা তিনজন ব্যক্তি তাকে বাইরে ডেকে নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাছাকাছি একটি গলিতে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, খুব কাছ থেকে তার মাথায় গুলি চালানো হয় এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো স্পষ্ট নয় এবং তদন্ত চলছে। কিছু প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলার কথা উল্লেখ করা হলেও এসব মামলার প্রকৃতি ও প্রেক্ষাপট নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তখনো পাওয়া যায়নি।
সরৎ মণি চক্রবর্তীর ওপর আকস্মিক হামলা
একই দিন রাতে নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার চারসিন্দুর বাজারে আরও একটি নৃশংস ঘটনা ঘটে। ৪০ বছর বয়সী মুদি দোকানদার সরৎ মণি চক্রবর্তী নিজের দোকানে কাজ করছিলেন, এমন সময় অজ্ঞাত ব্যক্তিরা ধারালো অস্ত্র নিয়ে তার ওপর হামলা চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলে পথেই তার মৃত্যু হয়। তিনি স্ত্রী অন্তরা মুখার্জি ও ১২ বছর বয়সী এক পুত্রসন্তান রেখে গেছেন। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, সরৎ মণি চক্রবর্তী কয়েক বছর দক্ষিণ কোরিয়ায় কাজ করার পর দেশে ফিরে ব্যবসা শুরু করেছিলেন এবং এলাকায় তিনি শান্ত স্বভাবের মানুষ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।
সাম্প্রতিক সহিংসতার ধারাবাহিকতা এবং সংখ্যালঘুদের আতঙ্ক
এই দুই হত্যাকাণ্ড সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া সহিংস ঘটনার তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে। গত এক মাসে বিভিন্ন জেলায় একাধিক হিন্দু নাগরিককে হত্যা, গণপিটুনি এবং অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধের অভিযোগ, কোথাও ধর্মীয় অবমাননার গুজব, আবার কোথাও সম্পূর্ণ অজ্ঞাত উদ্দেশ্যে হামলার ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান অস্থির রাজনৈতিক বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা এবং উসকানিমূলক পরিস্থিতি এই ধরনের সহিংসতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
নিরাপত্তা, তদন্ত এবং রাষ্ট্রের প্রতি প্রত্যাশা
এই পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে। শুধু নিহতদের পরিবার নয়, সাধারণ হিন্দু নাগরিকদের মধ্যেও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে—তারা কতটা নিরাপদ। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত, অপরাধীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। নইলে এই ধরনের ঘটনা শুধু সামাজিক সম্প্রীতিই নয়, দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।


