বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ২০২৪–২৫ সালের অন্তর্বর্তী শাসনকাল। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট ২০২৪ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনুস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন। কিন্তু সেই সময়কার প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে এবার সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন। তাঁর অভিযোগ—তাকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে দূরে রাখা হয়েছিল এবং সংবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরামর্শ বা ব্রিফিং দেওয়া হয়নি। এই বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই নতুন কৌতূহল ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সংবিধান মানা হয়েছিল, নাকি উপেক্ষা করা হয়েছিল?
রাষ্ট্রপতির বক্তব্য অনুযায়ী, সংবিধান পরিষ্কারভাবে নির্দেশ দেয় যে প্রধান উপদেষ্টা বিদেশ সফরের পর রাষ্ট্রপতিকে লিখিতভাবে অবহিত করবেন এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তের আগে পরামর্শ করবেন। তিনি দাবি করেন, ড. ইউনুস প্রায় ১৪–১৫টি বিদেশ সফর করলেও সেসব সফরের আলোচনা বা ফলাফল সম্পর্কে তাঁকে জানানো হয়নি। এমনকি নির্বাচন-পূর্ব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রেও তাঁকে অবহিত করা হয়নি বলে তিনি জানান। বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক মতবিরোধ নয়—এটি সরাসরি সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন তুলছে।
১৮ মাসের ঝড়ো সময়কাল
রাষ্ট্রপতি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস তাঁর জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, সেই সময় দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নষ্ট করার চেষ্টা হয়েছিল এবং সাংবিধানিক সংকট তৈরির আভাস দেখা দিয়েছিল। বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভ এবং তাঁকে অপসারণের প্রচেষ্টা নিয়েও তিনি ইঙ্গিত দেন। তাঁর দাবি, তিনি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দৃঢ় ছিলেন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অংশ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিল।
প্রটোকল, মর্যাদা ও আস্থার সংকট
রাষ্ট্রপতির আরও অভিযোগ—তাঁকে বিদেশ সফরে যেতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে তাঁর অনুমতি ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কাতার সফরের আমন্ত্রণের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁর সঙ্গে পরামর্শ না করেই একটি চিঠি প্রস্তুত করা হয় যাতে উল্লেখ ছিল যে তিনি রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকায় সফরে যেতে পারবেন না। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, বিদেশে বাংলাদেশি মিশনগুলোতে রাষ্ট্রপতির প্রতিকৃতি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল, যা দীর্ঘদিনের প্রথার বিরোধী। এসব ঘটনাকে তিনি রাষ্ট্রপতির পদমর্যাদা খাটো করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তন
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে রাজনৈতিক সমর্থনের প্রসঙ্গ। তিনি উল্লেখ করেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাঁর সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করেছে এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার আশ্বাস দিয়েছে। এই অংশটি ইঙ্গিত করে যে অন্তর্বর্তী সময়কালে ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে আস্থার ঘাটতি ছিল, যা পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন রূপ নিয়েছে।
তরুণ প্রজন্মের জন্য বড় শিক্ষা
এই পুরো বিতর্ক আমাদের মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন নয়, বরং নিয়ম, জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কোনো নেতা যতই জনপ্রিয় বা আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত হোন না কেন, সংবিধানের কাঠামোর ভেতরে থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয়। তরুণদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রাজনীতি শুধু ব্যক্তি নয়, এটি প্রতিষ্ঠান ও নিয়মের সমন্বিত কাঠামো। যদি সেই কাঠামোয় স্বচ্ছতা ও যোগাযোগের ঘাটতি তৈরি হয়, তাহলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, রাষ্ট্রপতির এই বিস্ফোরক মন্তব্য কেবল অতীতের একটি অধ্যায় নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি; এটি ভবিষ্যতের রাজনীতিতেও একটি বড় আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে—রাষ্ট্র পরিচালনায় সংবিধান কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, আর ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিরা কতটা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন।


