বাংলাদেশে শেখ হাসিনার পতনের পর রাজনীতির দৃশ্যপট劇ভাবে বদলে গেছে। দেশের ভেতরে যেখানে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ, বিচারের মুখোমুখি এবং রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা, সেখানে ভারতের কলকাতা ও দিল্লিতে বসেই দলটির নেতারা ভবিষ্যৎ প্রত্যাবর্তনের হিসাব কষছেন। আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই নির্বাসিত রাজনীতি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক কূটনীতিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
কলকাতায় নির্বাসিত নেতৃত্ব ও সংগঠন টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা
ক্ষমতাচ্যুতির পর সহিংস প্রতিক্রিয়া ও মামলার চাপে আওয়ামী লীগের শত শত নেতা ভারতে আশ্রয় নেন, যাদের একটি বড় অংশ কলকাতায় অবস্থান করছে। সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতারা সেখানে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক ও যোগাযোগের মাধ্যমে দলীয় কাঠামো টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরাসরি অংশগ্রহণ বন্ধ থাকলেও, নির্বাসনে থেকেও সংগঠনকে সক্রিয় রাখাই এখন তাদের মূল কৌশল।
শেখ হাসিনার কেন্দ্রীয় ভূমিকা ও দূরনিয়ন্ত্রিত নেতৃত্ব
দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে অবস্থান করেও শেখ হাসিনা দলীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছেন। নিয়মিত বৈঠক, দীর্ঘ ফোনালাপ এবং নির্দেশনার মাধ্যমে তিনি দেশে থাকা ও নির্বাসিত নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তার ঘনিষ্ঠদের মতে, আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আন্দোলন ও অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগের ফেরার পথ তৈরি হতে পারে—এই বিশ্বাসেই তিনি এখনো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়।
নিষিদ্ধ দল ও নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক
অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করায় নির্বাচন ঘিরে বৈধতার প্রশ্ন উঠেছে। আওয়ামী লীগের দাবি, দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে বাইরে রেখে নির্বাচন হলে তা গণতান্ত্রিক হতে পারে না। এ অবস্থায় দলটির অনেক নেতা কর্মীদের নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানাচ্ছেন এবং পুরো প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
অতীত শাসনের বোঝা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট
আওয়ামী লীগ এখন গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা বললেও, দীর্ঘ ক্ষমতাকালে দমন-পীড়ন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ তাদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করেছে। অনেক নাগরিকের কাছে এই অবস্থানকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধেও আইনশৃঙ্খলা অবনতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ উঠছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ভারতের ভূমিকা ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন
ভারতের মাটিতে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতাদের রাজনৈতিক তৎপরতা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ না হওয়া এবং তার প্রকাশ্য বক্তব্য বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তুলছে। ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে নীরব থাকলেও, এই অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে ভারতের ভূমিকাকে নতুনভাবে আলোচনায় এনেছে।
প্রত্যাবর্তনের আশা নাকি শেষ আশ্রয়ের রাজনীতি
নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতারা বিশ্বাস করেন, বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং অস্থিরতা জনগণকে আবার তাদের দিকে ফিরিয়ে নেবে। তবে বাস্তবতা হলো, প্রত্যাবর্তন নির্ভর করছে বিচারপ্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা, নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে জনগণের আস্থার ওপর। অতীতের বোঝা কাটিয়ে নতুন রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
উপসংহার
ভারতে নির্বাসিত অবস্থায় আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক অনিশ্চিত পথে দাঁড় করিয়েছে। এটি শুধু একটি দলের ক্ষমতায় ফেরার গল্প নয়, বরং গণতন্ত্র, বিচার এবং আঞ্চলিক রাজনীতির জটিল সমীকরণ। এই সমীকরণ কোন দিকে যাবে, তা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।


