প্রবীণ নেতা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন কারাবন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন, যা দেশের রাজনীতিতে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। পাঁচবারের সংসদ সদস্য সেন সর্বশেষ ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হন এবং দীর্ঘ সময় ধরে তিনি আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তার রাজনৈতিক জীবন কেবল ক্ষমতার কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তৃণমূল পর্যায়ে তার শক্ত অবস্থান তাকে একজন গণভিত্তিসম্পন্ন নেতায় পরিণত করেছিল।
কারাবন্দিত্ব, অসুস্থতা ও অবহেলার অভিযোগ
মৃত্যুকালে রমেশ চন্দ্র সেনের বয়স ছিল ৮৫ বছর এবং তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, কারাগারে একজন সাবেক মন্ত্রী হিসেবে যে চিকিৎসা ও যত্ন পাওয়ার কথা ছিল, তা তিনি পাননি। অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীনে কারাগারের স্বাস্থ্যসেবা ও বন্দিদের দেখভালের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে, বিশেষ করে তার গুরুতর অসুস্থতার সময় যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়নি বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিতর্ক
রমেশ চন্দ্র সেনের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যার মধ্যে একটি ছিল হত্যা মামলা। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক মামলার যে ধারা শুরু হয়, তার প্রেক্ষাপটে এই অভিযোগগুলোকে অনেকেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে দেখছেন। গ্রেপ্তারের সময় তার হাত গরু বাঁধার দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থার ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয় এবং রাষ্ট্রীয় আচরণের মানবিক দিক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।
সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও মানবাধিকার প্রশ্ন
তার মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, যেখানে অনেকেই একে “কারাগারে হত্যা” বা “হেফাজতে মৃত্যু” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ২০২৪ সালের আগস্টের পর সহিংসতা ও রাজনৈতিক মৃত্যুর দীর্ঘ তালিকার সঙ্গে রমেশ চন্দ্র সেনের নাম যুক্ত হওয়ায় মানবাধিকার, আইনের শাসন ও রাজনৈতিক সহনশীলতা নিয়ে উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে। এই মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও নৈতিকতার পরীক্ষাও হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনীতিতে তার প্রভাব ও রেখে যাওয়া প্রশ্ন
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতো প্রভাবশালী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তোলা রমেশ চন্দ্র সেন ছিলেন দৃঢ়চেতা ও কৌশলী নেতা। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে তার ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি জাতীয় রাজনীতিতেও তিনি ছিলেন প্রভাবশালী কণ্ঠ। তার মৃত্যু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ, বিচারিক স্বচ্ছতা এবং কারাবন্দিদের অধিকার নিয়ে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে গেছে, যার উত্তর খোঁজা এখন সময়ের দাবি।


