বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দেশ-বিদেশে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে হিন্দুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। এই পরিস্থিতি জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে বাংলাদেশকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
সহিংসতার পরিসংখ্যান ও মানবিক সংকট
সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশজুড়ে হিন্দুদের বিরুদ্ধে দুই হাজারের বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে। মাত্র ৩৫ দিনের ব্যবধানে অন্তত ১১ জন হিন্দু নাগরিক নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় কোথাও বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোথাও মন্দির ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। অনেক এলাকায় সংখ্যালঘু পরিবারগুলো চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, যা একটি গভীর মানবিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
যুক্তরাজ্যের সংসদে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ
এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও প্রতিফলিত হয়েছে। যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ পার্টির এমপি বব ব্ল্যাকম্যান প্রকাশ্যে বাংলাদেশে হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “হিন্দু পুরুষদের রাস্তায় হত্যা করা হচ্ছে, তাদের ঘরবাড়ি ও মন্দির পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, এবং অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাও একই পরিণতির শিকার হচ্ছেন।” ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ব্ল্যাকম্যান আসন্ন সাধারণ নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, নির্বাচন ঘোষিত হলেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া গণতন্ত্র ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। পাশাপাশি তিনি দেশে ইসলামপন্থী শক্তির প্রভাব বৃদ্ধির বিষয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও গণতান্ত্রিক প্রশ্ন
বব ব্ল্যাকম্যান ছাড়াও যুক্তরাজ্যের আরও কয়েকজন সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগসহ জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর উপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে যৌথভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে নির্বাচনের বাইরে রাখলে সেই নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য ও প্রতিনিধিত্বমূলক হবে—সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে। বাংলাদেশের মতো একটি বহুদলীয় ও বহুধর্মীয় সমাজে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সীমিত হলে তার প্রভাব সরাসরি সামাজিক স্থিতিশীলতার উপর পড়ে, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর সহিংসতা নিয়ে ভারতও স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর বারবার হামলার একটি “উদ্বেগজনক ধারা” দেখা যাচ্ছে। এই ধরনের সাম্প্রদায়িক ঘটনা দ্রুত ও কঠোরভাবে দমন করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতের বক্তব্যে স্পষ্ট, এই সহিংসতা শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
রাষ্ট্রের জন্য কঠিন বার্তা
নির্বাচন-পূর্ব এই সংবেদনশীল সময়ে বাংলাদেশ সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আস্থার সংকট দূর করা। সংখ্যালঘুদের উপর সহিংসতার অভিযোগ যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা দেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
উপসংহার
বাংলাদেশের ইতিহাস বহুত্ববাদ ও সহাবস্থানের সাক্ষ্য বহন করে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ সেই ঐতিহ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে এই সংকট সমাধান করা শুধু রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নৈতিক পরীক্ষাও। কার্যকর পদক্ষেপ ও নিরপেক্ষ প্রশাসনিক ভূমিকা ছাড়া এই আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।


