বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও উত্তপ্ত। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পর শেখ হাসিনার দেশত্যাগ ও তার পরবর্তী সময়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক ভারসাম্য এখন এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি শেখ হাসিনা যে শর্তসমূহ দিয়ে নিজের দেশে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছেন, তা শুধু তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্র, নির্বাচন এবং ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দিকেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের শর্তাবলী
শেখ হাসিনা স্পষ্ট করেছেন যে, তাঁর দেশে ফেরার পথ নির্ভর করছে তিনটি প্রধান শর্ত পূরণের ওপর। প্রথমত, একটি অংশগ্রহণমূলক ও স্বাধীন নির্বাচনের নিশ্চয়তা। দ্বিতীয়ত, তাঁর দল আওয়ামী লীগের ওপর থাকা রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। তৃতীয়ত, গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামো ও সংবিধানিক ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
এই শর্তগুলো কেবল রাজনৈতিক দাবিই নয়—এগুলো দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তিনি জানিয়েছেন, গণতন্ত্রের যে ভিত্তি তাঁর শাসনামলে দুর্বল হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন, সেটিকে পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।
ইউনুস ও অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা
শেখ হাসিনা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে কাজ করা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের প্রতি কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ইউনুস সরকারের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া দেশের গণতন্ত্রকে ক্ষুণ্ন করছে এবং বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে দুর্বল করছে।
এই বক্তব্য কূটনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে, কারণ বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। শেখ হাসিনার বক্তব্য সেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
ভারতের ভূমিকা ও আঞ্চলিক প্রভাব
ভারত সবসময় শেখ হাসিনার সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। তিনি বর্তমানে ভারতের মাটিতে অবস্থান করছেন, যা দুই দেশের পারস্পরিক বিশ্বাস ও কৌশলগত সম্পর্কের প্রতিফলন। তবে এই পরিস্থিতি নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়—যেখানে ভারতকে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আঞ্চলিক কূটনীতির মধ্যে।
বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত বাণিজ্য, জলসম্পদ বণ্টন ও রোহিঙ্গা সমস্যা—সব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন কেবল একটি ব্যক্তিগত বা দলীয় ঘটনা নয়, বরং এটি আঞ্চলিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে।
রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও গণতন্ত্রের পুনর্গঠন
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিভাজন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রের কার্যকারিতা ব্যাহত করেছে। শেখ হাসিনার নতুন অবস্থান হয়তো সেই ভাঙন মেরামতের সুযোগ এনে দিতে পারে, যদি তাঁর ঘোষিত শর্তগুলো বাস্তবায়নের দিকে এগোনো হয়। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—দেশের অভ্যন্তরে ক্ষমতাসীন শক্তিগুলো কি সত্যিই মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত? নাকি এই ঘোষণাও এক রাজনৈতিক কৌশল মাত্র, যা ভবিষ্যতের ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি করতে ব্যবহৃত হবে?
উপসংহার
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ঘিরে বাংলাদেশ এখন এক অস্থির কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। তাঁর শর্তগুলো দেশের গণতন্ত্র পুনর্গঠনের পথ খুলে দিতে পারে, আবার তা রাজনৈতিক সংঘাতকেও তীব্র করতে পারে।
যেভাবেই ঘটনাপ্রবাহ এগোক, একথা নিশ্চিত—বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক নতুন অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রত্যেক সিদ্ধান্ত দেশটির ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।


